বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে সম্প্রতি পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছিল। অবশেষে কর্তৃপক্ষ একটি নিয়মিত কাঠামো তৈরির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়।
কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন নৌ রুটে পর্যটকবাহী ‘কেয়ারী সিন্দাবাদ’ নামের একটি জাহাজ পর্যটন মৌসুমে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলের এই অনুমতি দিয়েছে।
সোমবার (২৫ নভেম্বর) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি সাংবাদিকদের জানান, জেলা প্রশাসকের কাছে শুধু চলাচলের জন্য পর্যটকবাহী জাহাজ ‘কেয়ারী সিন্দাবাদ’ আবেদন করেছিল।
মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলুফা ইয়াছমিন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, আগামী ২৭ নভেম্বর তারা কমিটির বৈঠক আহ্বান করেছেন। সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে কোন জায়গা থেকে জাহাজ ছাড়বে।
পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব
সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য প্রকৃতির দান। এটি কেবল সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত নয়, বরং দ্বীপের পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যও অত্যন্ত সংবেদনশীল। পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের অসংযত উপস্থিতি এবং এর কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন।
নতুন অনুমতিতে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আরোপ করা হয়েছে, যাতে জাহাজ চলাচল পরিবেশের ওপর ন্যূনতম প্রভাব ফেলে। প্রতিদিন কতজন পর্যটক যেতে পারবেন এবং কীভাবে দ্বীপে তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মাবলী
১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক জাহাজ সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।
২. প্রতিটি জাহাজে যাত্রী ধারণক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
৩. দ্বীপে পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
৪. দ্বীপে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং আবর্জনা ফেলার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম মানতে হবে।
৫. পর্যটকরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দ্বীপ ত্যাগ করবেন।
পর্যটন শিল্পের জন্য ইতিবাচক দিক
নতুন এই সিদ্ধান্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটন খাতের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত জাহাজ চলাচল পর্যটকদের কাছে একটি বিশেষ আকর্ষণ। জাহাজ চলাচলের অনুমতি পুনরায় চালু হওয়ায় পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় হোটেল-মোটেল মালিক এবং দ্বীপের বাসিন্দারা আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন।
চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিক্রিয়া
যদিও এই সিদ্ধান্ত পর্যটকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে, পরিবেশবিদরা এটিকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা মনে করেন, সঠিক বাস্তবায়ন ছাড়া এই পরিকল্পনা পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, স্থানীয় জনগণও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, পর্যটন দ্বীপের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে তারা প্রত্যাশা করেন যে পরিবেশগত দিকটি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে।
সেন্ট মার্টিনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল একটি জটিল সিদ্ধান্ত। তবে পরিবেশ ও পর্যটনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এটি বাস্তবায়ন করা গেলে, দ্বীপের সৌন্দর্য এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উভয়ই টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই পরিকল্পনাকে সঠিকভাবে কার্যকর করে।

0 Comments